Home Column ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বাধীনতা এসেছে !!!— ইঞ্জিনিয়ার মোঃ...

১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বাধীনতা এসেছে !!!— ইঞ্জিনিয়ার মোঃ জসীম উদ্দিন —

315
0
SHARE

১৬ ডিসেম্বের আমাদের মহান বিজয় দিবস, অপরিসীম ত্যাগ আর বিসর্জনের বিনিময়ে অর্জিত এই আমাদের বাংলাদেশ। স্বাধীনতা অর্জনের পর কেটে গেছে অনেক বছর। প্রত্যাশা, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তির সমন্বয়ে নানা বিশ্লেষণে এই সুদীর্ঘ পথযাত্রায় বাংলাদেশকে অনেক চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে যেতে হয়েছে। তারপরও প্রতিবছর নিজ মহিমায় এই দিনটির আবেদন চিরকাল সমুজ্জল থাকবে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে। বিজয়ের এই দিন গতানুগতিক রোজকার রুটিন থেকে একটু যেন অনরকম, মহান করুণাময়ের কৃপায় প্রকৃতির নিয়ম সূর্যের লাল আলো বিকিরিত আলো প্রবাহিত হয় এক ভিন্ন গৌরবময় দৃপ্তপ্রভায়। এই আলো স্মরণ করিয়ে দেয় এই বিশেষ দিনটির এক গৌরবময় শহিদের আত্মত্যাগের বিরল ইতিহাসের কথা। এই দিনটিতে ঢাকার রমনার রেসকোর্স ময়দান এ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় পাকিস্তানী অপশক্তি। স্বাধীনতার আলোর পরশ ছড়িয়ে পড়লো আমাদের সাহিত্য, আমাদের চিন্তার কৃষ্টির মর্মমূলে। কবি মোঃ মহসিন হোসাইনের ভাষায়-

“মহান বিজয় দিবস ১৬ই ডিসেম্বর, জাতির অহঙ্কার,
এ বিজয়কে রাখবো সমুন্নত, এই হোক অঙ্গীকার।
একাত্তরে সাড়ে সাতকোটি বাঙালি হয়েছিল ঐক্যবদ্ধ,
২৬ মার্চ থেকে শুরু হয়, ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ।

ত্রিশলক্ষ শহীদের বুকের তাজা রক্ত দিয়েছিল বিসর্জন,
অবশেষে হানাদার পাকিস্তানবাহিনী করলো আত্মসমর্পণ।
বীর বাঙালিদের কাছে তারা করেছিল শির অবনত,
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠালাভ করেছে, স্বাধীন সার্বভৌমত্ব।

মুক্তিকামী জনতা প্রায় খালি হাতে, দাঁড়িয়েছিল রুখে!
জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাষাণ বেঁধে বুকে।
যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা;
ভুলবো না সেই দুঃসাহসী বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধাদের কথা।

জীবন উৎসর্গ করে উপহার দিয়েছে লাল-সবুজের পতাকা,
এনেছে ৫৬হাজার বর্গ মাইলের স্বাধীন বাংলার সীমারেখা।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ;
এত বছর পরেও কি করতে পেরেছি তাদের স্বপ্ন পূরণ?

দূর করতে হবে বৈষম্য বিভাজন, চাই অর্থনৈতিক মুক্তি,
রুখতে হবে সকল বঞ্চনা, আছে উনিশ কোটি জনশক্তি।
লাখো শহীদের আত্মত্যাগে অর্জিত গৌরবময় এ বিজয়,
সকলে মিলে গড়বো দেশ, মানবো না কোনো পরাজয়।”

বিজয় দিবসের এই দিনে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সবপ্রান্তে বাংলাদেশিদের ঘরে ও নানা আনুষ্ঠানিকতায় মুখরিত হয়ে বিজয়ের গান। আমাদের জন্মভূমি ও মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার প্রয়াসে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, তিরিশ লক্ষ শহিদদের মহান আত্মত্যাগ আর কয়েক লক্ষ মা ও বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালি জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। দেশাত্মবোধের চেতনা, ঐক্যবদ্ধ শক্তি, অসংখ্য আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর আমরা পেয়েছি ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এক স্বাধীন ভূ -খন্ড। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানী সামরিক শাসক বাংলাদেশের নিরীহ জনগণের উপর রাতের অন্ধকারে যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, সৃষ্টি করেছিল এক কলঙ্কময় নারকীয় অধ্যায়। সেই স্মৃতি কোনদিন ভুলবেনা সচেতন দেশাত্মবোধের আদর্শে লালিত বাংলার মানুষ। একই সাথে তাঁরা ভুলবেন না নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধকে। চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে এক সুদীর্ঘ অপেক্ষার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে সোনার বাংলার নিরীহ মানুষকে। বহু প্রতীক্ষিত আকাঙ্খার এই বিজয় একদিনে আসেনি। পাকিস্তানি পরাশক্তির দীর্ঘকালীন অসহযোগ, আগ্ৰাসন, অবিচার, শোষণ এর বিরুদ্ধে অনেক ত্যাগ, সংগ্রামের আন্দোলনের এক সোনালী ইতিহাসের ধারাবাহিকতার পটভূমিকায় গড়ে উঠেছে এই চূড়ান্ত বিজয়।

১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা এসেছে, আমাদের জন্মভূমি স্বীকৃত হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব। ঢাকার অদূরে সাভার বাংলাদেশের শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন কর্তৃক নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধের সাতটি স্তম্ভ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সোনালী অতীতে আন্দোলনের ধারাবাহিকতাকে। যেমন- ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬’র শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ও আহ্বান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

বিজয় দিবসে সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি ভবনে সর্বস্তরে জাতীয় পতাকা উড্ডীন থাকে, বিশ্বের অনেক প্রান্তে যেখানে বাংলাদেশিরা আছেন সকলের ঘরে ঘরে লাল-সবুজ পতাকায় রঙের আবহে চলে ছোট বড় নানা আয়োজনের প্রচেষ্টা। বাংলাদেশে সূর্যোদয়ে সাথে সাথে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে স্বাধীনতার শহীদদের অমর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় নেতারা। শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অন্তর্গত হন রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সর্বস্থরের মানুষ।

কিন্ত এত বর্ণাঢ্য আয়োজনের পরও বাংলাদেশের সচেতন মানুষের মনে কম বেশি দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, স্বাধীনতা চেতনায় আদর্শের সঠিক মূল্যায়ন করতে কি আমরা পেরেছি? দেশে অনেক ক্ষেত্ৰই পরিবর্তন আসছে, কিন্তু স্বাধীনতার সঠিক সমুন্নত অর্থ কি আমরা রাখতে পারছি?আমি স্বাধীনতা স্বচক্ষে দেখেছি। তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম।

দেশে বিরাজমান সমস্যা, দারিদ্র, দুর্নীতি, নারীর প্রতি বৈষম্য অনাচার, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও অসহনশীলতা, নানাভাবে বিভিন্ন বিভ্রান্ত, অপশক্তির মাথা চাড়া দিয়ে উঠা বাংলাদেশে বিরাজমান অস্থিতিশীলতা, অসহিষ্ণু মনোভাব ও ঘন ঘন রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে তাঁরা বেশ বিচলিতবোধ করতেন। এই দিন আব্বা ও আম্মা খুব আগ্রহ ভরে আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্থাপত্য কীর্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার চেষ্টা করতেন। আমি বন্ধু বান্ধব সহযোগে মাঝে মধ্যে বেড়াতে বের হতাম, দেশে এই দিনটির উৎসব মুখর পরিবেশ আমার কাছে সব সময়েই ছিল আনন্দের।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের এক রাতে নিজ হাতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার প্রস্তুত করার গল্প, সেই পতাকায় সেলাই করেছিলেন নতুন বাংলাদেশের মানচিত্র। আম্মা সকলের অগোচরে সেদিন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা তৈরি করেছিলেন। তিনি অনেক সময়ে সঙ্গোপনে হাতে বেলা রুটি বানিয়ে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার হাত দিয়ে মুক্তিযাদ্ধাদের জন্যে পাঠিয়ে দিতেন। কি কঠিন সময়, স্বাধীন দেশের প্রত্যাশায় তাঁরা সেই দিনগুলি অতিবাহিত করেছিলেন সেই কথা কম বেশি তাঁদের এই বিশেষ দিনের কথপোকথনের অন্তর্গত হতো। যা শুনেছি ছবির মতো উজ্জ্বল আর ভীষণ বাস্তব হয়ে আছে আত্মত্যাগের ইতিহাস সমৃদ্ধ তাঁদের মুখ নিঃসৃত প্রতিটি বক্তব্যে। বিজয় দিবসের দিনটি আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যময়, তাই শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে বিজয় দিবসকে সীমাবদ্ধ না রেখে কষ্টার্জিত স্বাধীনতার যথাযথ সংরক্ষণে আমাদের এই দিনে বিশেষভাবে অংঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা গতিশীল, প্রকৃত আদর্শকে সঠিকভাবে রক্ষা করার নিরিখে বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে আমাদের প্রত্যেকের অবস্থান ও ক্ষমতা অনুসারে বাংলাদেশের বাঙালির কৃষ্টি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে আমাদের দেশ গঠনে একযোগে কাজ করাই একান্ত কাম্য।

লেখক পরিচিতিঃ
বিশিষ্ট কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনীতিবিদ।
সাধারণ সম্পাদকঃ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, জাপান শাখা।
সম্মানিত সদস্যঃ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, কচুয়া উপজেলা পাথৈর ইউনিয়ন।
সভাপতিঃ বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী পরিষদ, জাপান শাখা।
প্রধান উপদেষ্টাঃ মানবতার ডাক সামাজিক সংগঠন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here