Home Column ​প্রত্যেক রক্তদাতাই একজন বীর !!! — মোঃ মহসিন হোসাইন —

​প্রত্যেক রক্তদাতাই একজন বীর !!! — মোঃ মহসিন হোসাইন —

315
0
SHARE

রক্তদান একটি মহৎ গুন। রক্তদানের মাধ্যমেই দেশ ও জাতীর সেবা করার অন্যতম একটি উপায়। রক্তদানের মাধ্যমে রক্তদাতা হতে পারে সুস্থ ও সাবলীল, এর মাধ্যমে ফিরে পেতে পারে অপরজনের জীবন।
ইংরেজ চিকিৎসক ডাঃ উইলিয়াম হার্ভে ১৬১৬ সালে গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে মানবদেহের অভ্যন্তরে রক্ত প্রবাহিত হয়। এর অনেক পরে ডাঃ জেমস ব্লান্ডেল নামে একজন ইংরেজ ধাত্রীবিদ্যাবিশারদ ১৮১৮ সালে রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন যা দিয়ে সর্বপ্রথম সফলভাবে একজন সুস্থ মানুষের দেহ থেকে আরেকজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের দেহে রক্ত পরিসঞ্চালন করে তাকে বাঁচিয়ে তোলা হয়। এভাবেই মানুষের শরীরে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার শুরু এবং এরপর থেকেই মানুষের দেহে রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে মৃত্যুর পথ থেকে ফিরিয়ে সুস্থ করা হয়ে আসছে।
রক্তদানে শরীরের কোন ক্ষতি হয়না। ছেলেদের শরীরে ওজনের কেজি প্রতি ৭৬ মিলিলিটার আর মেয়েদের শরীরে ওজনের ৬৬ মিলিলিটার করে রক্ত থাকে এবং সবারই কেজি প্রতি ৫০ মিলিলিটার রক্ত সংবহনের জন্য প্রয়োজন হয়, বাকিটা থাকে উদ্বৃত্ত। অর্থাৎ ছেলেদের ওজনের কেজিপ্রতি ২৬ মিলিলিটার আর মেয়েদের ওজনের কেজিপ্রতি ১৬ মিলিলিটার রক্ত থাকে উদ্বৃত্ত। ফলে ৫০ কেজি ওজনের একটি ছেলের শরীরে উদ্বৃত্ত রক্তের পরিমাণ ৫০x২৬=১৩০০ মিলিলিটার আর একই ওজনের একজন মেয়ের শরীরে উদ্বৃত্ত রক্তের পরিমাণ ৫০x১৬=৮০০ মিলিলিটার । আর স্বেচ্ছায় রক্তদানে একজন রক্ত দাতার কাছ থেকে মাত্র ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার রক্ত সংগ্রহ করা হয়। তাই রক্তদানে শারীরিক কোন ক্ষতি হবার সম্ভাবনাই নেই। আর একজন সুস্থ লোক প্রতি চারমাস পরপর রক্ত দান করতে পারেন। মানুষের শরীররে রক্ত উপাদান গুলি প্রতি চার মাস পর এমনিতেই নষ্ট হয়ে নতুন রক্ত উৎপাদিত হয়। তাই রক্ত দান করলে শরীরের ক্ষতি তো হয়ইনা বরং আছে অনেক উপকার।
রক্তদানের উপকারিতাঃ-
রক্তদান স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কারণ রক্তদান করার সঙ্গে সঙ্গে আপনার শরীরের মধ্যে অবস্থিত ‘বোন ম্যারো’ নতুন কণিকা তৈরির জন্য উদ্দীপ্ত হয়। রক্তদানের ২ সপ্তাহের মধ্যে নতুন রক্তকণিকা জন্ম হয়ে এই ঘাটতি পূরণ করে। আর বছরে ৩ বার রক্তদানকারীর শরীরে লোহিত কণিকাগুলোর প্রাণবন্ততা বাড়িয়ে দেয়।

***নিয়মিত রক্তদানে হৃদযন্ত্রের সামগ্রিক উন্নতি হয়। রক্তে যদি লৌহের পরিমাণ বেশি থাকে তাহলে তাহলে কোলেস্টেরলের অক্সিডেশনের পরিমাণ বেড়ে যায়, ধমনী ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ফলাফল হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত রক্ত দিলে দেহে লৌহের পরিমাণ কমে যায় যা, হৃদ রোগের ঝুঁকিকেও কমিয়ে দেয় কার্যকর ভাবে। যারা নিয়মিত রক্তদেন তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ৮৮ ভাগ কমে যায় এবং স্ট্রোক সহ অন্যান্য হৃদ রোগের ঝুঁকি কমে যায় ৩৩ ভাগ।
***অতিরিক্ত ক্যালরি ক্ষয়ঃনিয়মিত রক্তদানে শারীরিক ফিটনেস বাড়ে। ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত দান করলে রক্ত দাতার দেহ থেকে ৬৫০ ক্যালরি পুড়ে। তাতে রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিক থাকে এবং ডায়বেটিসের ঝুঁকি কমে যায়।

*. রক্তদানের মাধ্যমে নিজেকে সুস্থ রাখার স্পৃহা জন্মে।

**. নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে বিনা খরচে জানা যায় নিজের শরীরে বড় কোনো রোগ আছে কিনা। যেমন : হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, সিফিলিস, এইচআইভি (এইডস) ইত্যাদি।

**.সম্প্রতি ইংল্যান্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী জটিল বা দুরারোগ্য রোগ-ব্যাধি থেকে প্রায়ই মুক্ত থাকেন।

**. নিয়মিত রক্তদানকারীর হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক কম ।

**. মুমূর্ষু মানুষকে রক্তদান করে আপনি পাচ্ছেন মানসিক তৃপ্তি। কারণ, এত বড় দান যা আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

**  রক্তদান ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত পুণ্যের বা সওয়াবের কাজ। পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার ৩২ নং আয়াতে আছে, ‘একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সমগ্র মানব জাতির জীবন বাঁচানোর মতো মহান কাজ।’
রক্তদানের পূর্বে ও পরে করণীয়ঃ
প্রাপ্তবয়স্ক অর্থাৎ ১৮ বছর বয়সের পর সুস্থ স্বাভাবিক সকলেই স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে পারেন। এবং পুরোপুরি সুস্থ সকলের রক্ত দেয়াই উচিত। আপনার দেয়া রক্তে হয়তো একজন অসুস্থ মানুষের জীবন বাঁচতে পারে। কিন্তু আপনি যদি নিজেই সম্পূর্ণ সুস্থ না হন তবে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু শুধু রক্ত দিলেই তো চলবে না, রক্ত দেয়ার ফলে রক্তদাতার যেনো শারীরিক কোনো সমস্যা না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। রক্ত দেয়ার পূর্বে এবং পরে একজন রক্তদাতার বিশেষ কিছু কাজ করা উচিত নিজের স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য। চলুন তবে দেখে নেয়া যাক কি কি কাজ করা উচিত।
রক্ত দেয়ার পূর্বে করনীয়ঃ
১) আপনি যদি কোনো কারণে অসুস্থবোধ করে তবে সেদিনের মতো রক্ত দেয়া থেকে বিরত থাকুন।

২) রক্ত দেয়ার পূর্বে পুষ্টিকর খাবার খেয়ে নিন, কিন্তু তৈলাক্ত কিছু খাবেন না।

৩) রক্ত দানের পূর্বে প্রচুর পরিমাণে পানি ও পানি জাতীয় খাবার খাবেন।

৪) যেদিন রক্ত দেবেন তার আগের রাতে অনেকটা সময় ভালো করে ঘুমিয়ে নেবেন।

৫) ভরাপেটে খাওয়ার ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পরে রক্ত দেয়া ভালো।

৬) খালি পেটে না দিয়ে হালকা খাবার খেয়ে রক্ত দেয়া ভালো।
রক্তদানের পরে করনীয়ঃ
১) অনেকটা সময় শুয়ে থাকবেন। হুট করে উঠে বসবেন না বা উঠে দাঁড়াবেন না।

২) প্রচুর পরিমাণে পানি ও পানি জাতীয় খাবার গ্রহন করুন। এই ব্যাপারে অবহেলা করবেন না মোটেও।

৩) আয়রন, ফোলাইট, রিবোফ্লাবিন, ভিটামিন বি৬ সমৃদ্ধ খাবার যেমন লাল মাংস, মাছ, ডিম, কিশমিশ, কলা ইত্যাদি ধরণের খাবার খাবেন।

৪) কয়েক ঘণ্টার জন্য শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করা থেকে বিরত থাকুন এবং বেশ কিছুদিন সাধারণ সময়ের তুলনায় একটু কম পরিশ্রম করে বিশ্রাম নিন।

৫) রক্তদানের ৩ মাস পর নতুন করে রক্ত দিতে পারবেন। এর আগে পুনরায় রক্ত দেবেন না।
প্রত্যেক রক্তদাতাই একজন বীর’। ১৯০১ সালে অস্ট্রিয়ান কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার রক্তের বিভিন্ন গ্রুপ আবিষ্কারের পরই শুরু হয় রক্তদান। তখন পর্যন্ত জানা যায়নি যে, ভিন্ন গ্রুপের রক্ত শরীরে নিলে মৃত্যু হতে পারে। ল্যান্ডস্টেইনার প্রথম আবিষ্কার করেন যে দাতা ও গ্রহীতার রক্ত একই গ্রুপের না হলে গ্রহীতার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ১৯৩০ সালে এই আবিষ্কারের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। এর পরই শুরু হয় নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন। এখন প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় তিন কোটি ২০ লাখ লোক রক্তদান করে থাকে। কিন্তু রক্তের প্রয়োজন আরো বেশি।
কেউ যখন স্বেচ্ছায় নিজ রক্ত অন্য কারো স্বার্থে দান করে, তাকে রক্তদান বলে। এ কারণে রক্তদাতার অবশ্যই সম্মতির প্রয়োজন আছে এবং এর মাধ্যমে পূর্ণ বয়স্ক নয় (১৮ বছরের নিচে) এমন কারো রক্ত নেওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এখনকার সময়ে অবশ্য ১৭ বছর হলেই রক্ত দেওয়ার উপযুক্ত ধরা হয়। রক্ত দেওয়ার আগে রক্তের স্ক্রিনিং টেস্ট বা দাতার রক্ত নিরাপদ কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া দাতা রক্তদানের জন্য উপযুক্ত কি না, তা জানার জন্য কিছু পরীক্ষাও করা হয়। যেমন- এনিমিয়া বা রক্তাসল্পতা, জন্ডিস, নাড়ির গতি বা পালস, শরীরের তাপমাত্রা এবং ওজন। অনেকে রক্ত দিতে দ্বিধায় ভোগেন। এর কারণ রক্তদানের পদ্ধতি ও পরবর্তী প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অযথা ভীতি। প্রত্যেক সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী প্রতি তিন মাস অন্তর নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে রক্তদান করতে পারেন। এতে স্বাস্থ্যে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব তো পরেই না, বরং নিয়মিত রক্তদানের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে।

* স্ক্রিনিংয়ের কারণে দাতা জানতে পারেন তিনি কোনো সংক্রামক রোগে ভুগছেন কি না।

* নিয়মিত রক্তদাতার হার্ট ভাল থাকে।

* নিয়মিত রক্তদানে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যায়। ফলে দাতার হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদির ঝুঁকি কমে যায়।

* নিয়মিত রক্তদানে দাতার শরীরের কিছু ভালো পরিবর্তন সাধিত হয়। কোনো দুর্ঘটনাজনিত কারণে দাতার শরীর থেকে কিছু রক্তপাত হলেও তার কোনো সমস্যা হয় না।

* শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়।

* কোনো সেন্টারে একবার রক্তদান করলে ওই সেন্টার দাতার প্রয়োজনে যেকোনো সময় রক্ত সরবরাহ করে থাকে।

* রক্তদানের মাধ্যমে মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ বাড়ে।

* ধর্মীয়ভাবেও এটি একটি প্রশংসনীয় দান।

লেখক পরিচিতিঃ

কবি, লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।

কেন্দ্রীয় সহ সাধারন সম্পাদকঃ বাংলাদেশ তৃণমূল সাংবাদিক কল্যাণ সোসাইটি।

সাধারন সম্পাদকঃ মানবতার ডাক সামাজিক সংগঠন।

নির্বাহী পরিচালকঃ পথের শিশুর পাঠশালা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here