Home Column ​মূল্যবোধ মানুষের কাজের ভালো-মন্দ বিচারের ভিত্তি !!!— মোঃ মহসিন হোসাইন —

​মূল্যবোধ মানুষের কাজের ভালো-মন্দ বিচারের ভিত্তি !!!— মোঃ মহসিন হোসাইন —

409
0
SHARE

আমাদের মূল্যবোধের সম্পূর্ণ অংশেই ঘুণ ধরেছে! মানুষের বৈশিষ্ট্য তো এই যে তারা সমাজ ও পরিবারে শান্তি বজায় রাখার জন্য সর্বদা সচেতন, এমন কি পরিচিত বা অপরিচিত যেই হোক, একের দুঃখে অপরে দুঃখিত হবে, সহমর্মিতা প্রকাশ করবে। মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য করে ঔচিত্যবোধ। অথচ এই সময়ে একের পর এক যেসব অকল্পনীয় ও শিউরে ওঠার মতো বীভৎস ঘটনা ঘটে চলেছে, তা কোনোভাবেই এদেশের মানুষের আচার-আচরণের সঙ্গে মেলে না।
বর্তমান সময়ে ব্যক্তি, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে যে অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে, তা মূল্যবোধের অভাবে, দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যায়ক্রমে ঘটে যাওয়া বর্বরোচিত ঘটনাই তার বাস্তব প্রতিচিত্র। এই অস্থিতিশীল পরিবেশকে স্থির এবং সৌহার্দপূর্ণ করার জন্য নৈতিক মূল্যবোধ একান্ত প্রয়োজন।
মানুষের মনোজগতকে নিয়ন্ত্রণ করে নৈতিকতা, আর তার আচার আচরণকে পরিমাপ করে মূল্যবোধ। আমরা জানি বোধ শব্দটির প্রতিশব্দ- জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, মেধাশক্তি, চেতনা, অনুভূতি, উপলব্ধি; আবার বিবেক, চিন্তা, বুদ্ধি ও ন্যায়পরায়ণতা হচ্ছে নৈতিকতার উৎস। এসবের মাধ্যমে ভালো-মন্দের বিচার করার ক্ষমতা দ্বারা মানুষের সামাজিক আচার-আচরণের সমষ্টিই মূল্যবোধ; যা সমাজের নানা ক্ষেত্র সুন্দর ও পরিপূর্ণ হতে সাহায্য করে। সহজভাবে বলা যায় মূল্যবোধ মানুষের কাজের ভালো-মন্দ বিচারের ভিত্তি।
প্রায় দেড়-দুই দশক পূর্বে কিংবা তারও অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারা যেত এবং সেসব ঘটনা তোলপাড় সৃষ্টি করলেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে গণ্য করা হতো। আর এখন সামাজিক ও পারিবারিক অপরাধমূলক ঘটনা এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে যে-এগুলো আর বিচ্ছিন্ন বলে এড়িয়ে যাবার নয়।
নীতি নৈতিকতা মূল্যবোধের অবক্ষয় ধরেছে সমাজ-রাষ্ট্রের প্রত্যেক শ্রেণিপেশার মধ্যে, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা সমাজে হাজার প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে, প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে সুস্থ সমাজপ্রত্যাশী নাগরিক মনে। এ কোন সমাজ গড়ছি আমরা? কী রেখে যাচ্ছি আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য?
দিন দিন নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা হুড় হুড় করে বেড়ে যাচ্ছে, একের পর এক খুন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের চিত্র পত্রিকা ও টিভি মিডিয়ার রোজকার শিরোনাম। রিশা, তনু এদের মর্মান্তিক মৃত্যু সামনে উঠে আসা খবর, খাদিজা লড়ছে মৃত্যুর সঙ্গে; দিনাজপুরের ৫ বছরের শিশু পূজার ওপর পাশবিক নির্যাতন; আরও অগণিত দুর্বিষহ ঘটনা আছে, যা সময়ের ভাঁজে ভাঁজে চাপা পড়ে গেছে, যাচ্ছে। আর এর প্রতিকার হওয়া তো দূরের কথা, যেন বীভৎসতার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কেন মূল্যবোধের এই অবক্ষয়?
রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখে আমরা প্রায় অভ্যস্ত, কিন্তু শিক্ষক সমাজে অবক্ষয়? শিক্ষকতা পেশায় থেকে অনেকেরই চারিত্রিক স্খলন নির্মমভাবে দুঃশ্চিন্তা এনে দিয়েছে অভিভাবক সমাজে। এক সময় এদেশে শিক্ষার হার খুব কম ছিল। বলা হতো অশিক্ষিত জাতি এবং বর্বর জাতির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। অথচ বর্তমানে শিক্ষার হার যথেষ্ট হলেও মানুষের আচার আচরণের মধ্যে পাশবিকতা বিরাজ করছে। মানবিক গুণাবলি থেকে এবং পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে গোটা সমাজ। সমাজে দুর্নীতিগ্রস্ত ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা নানারকম ভীতি সৃষ্টি করে সাধারণের জীবনযাপনকে দুঃসহ ও অসুস্থকরে তুলেছে। বিস্ময়ের ব্যাপার আমরাই ওদের অবস্থানকে শক্ত করার সুযোগ দিচ্ছি। ভীতি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর হুমকি মেনে নিচ্ছি; অন্যের বাঁচা-মরা নিয়ে টুঁশব্দ করি না। কীভাবে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করতে হবে তা জেনেও উদ্যেগী হই না। কত শিশু ও নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে প্রতিদিন তার সঠিক কোনো হিসাব নেই, সব ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে আসে না। সবটার প্রতিবাদও হয় না, অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে চুপ থাকে, যে দু’একটির প্রতিবাদ হয় তার বিচারকার্য চলতে থাকে বছরের পর বছর। আমাদের সমাজে নারী ও শিশুর প্রতি যে আক্রমণাত্মক পরিস্থিতি তা বেড়েই চলছে দিনের পর দিন, তা মূল্যবোধের অভাবে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অর্জন এ জাতির শ্রেষ্ঠতম অর্জন। কিছুসংখ্যক বিভ্রান্ত মানুষ ছাড়া সবাই এ জন্য সংগ্রাম করেছেন, সহ্য করেছেন সীমাহীন যন্ত্রণা। এমন বৃহৎ অর্জনকে অক্ষুন্ন রাখতে বা আরও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে দেশের নাগরিক হিসেবে মূল্যবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে আমাদের দায়িত্ব অনেক। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কাঙ্ক্ষিতভাবে সফল হয়েছে কি? লাখো শহীদের রক্তস্নাত বাংলার মাটি আজও দেখেই চলেছে- রক্ত। সময়ের আবর্তে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্য বিখন্ড হয়েছে, বিভক্তি এসেছে চেতনায়। জাতীয় লক্ষ্যও অনেক সময় ম্রিয়মাণ হয়েছে। যুগ ও সভ্যতার পরিবর্তনে সমাজের মানুষের মূল্যবোধেরও পরিবর্তন হয়। সহনশীলতা, আইনের শাসন ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের অভাবে মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। একটা সমাজের মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস, আচরণ এর উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সামাজিক মূল্যবোধ। অথচ আজকের দিনে বিষের মতো সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে- হিংসা, দলাদলি, অন্যায়-অনাচার, দুর্বলের ওপর অকথ্য নির্যাতন, ঘুষ, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি জঘন্য কার্যকলাপ; যা বিশ্বের কাছে আমাদের জাতির জন্য লজ্জার।
নৈতিক মূল্যবোধের এই ধ্বংসাত্মক চিত্র রোধে কর্মসূচি গ্রহণ করা এখন অতীব প্রয়োজন। আলো ও অন্ধকারের বিপরীতমুখী অবস্থানে ব্যক্তির মধ্যে চিন্তা বা বোধের জন্ম হয়। মানুষের জন্যই মানসিকতা শব্দটি নির্ধারিত; এই মানসিক পরিভ্রমণ দ্বারাই সঠিক বা ভুল নির্ণয় করা যায়। আর এই শিক্ষা ও মূল্যবোধ এর ভিত্তি প্রথমত, তৈরি হয় শৈশবে পরিবার থেকে ভদ্রতা, শিষ্টাচার, সততা, নিয়ম-নিষ্ঠা, সহনশীলতা, ন্যায়-পরায়ণতা ইত্যাদি দ্বারা। দ্বিতীয়ত, সূচনা হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আমাদের প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে সুন্দর ও সঠিক ভাবনা তুলে ধরা। অথচ আমরা খোঁজ রাখছি না আমাদের চারপাশেই উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা কীভাবে ভুল পথে নীরবে হাঁটছে। তাদের হাতের নাগালে পর্নো ছবি, অশ্লীল ভিডিও, নেশাজাত দ্রব্যের সহজলভ্যতা; রাতে দেরি করে বাড়ি ফেরা। ওদের অনেকেরই অভিভাবকরা দেখেও বিষয়টা তেমন আমলে নেন না। কোথায় ছিল? কেন ছিল? এসব প্রশ্ন তাৎক্ষণিক, এটুকু খোঁজ নিলেই বিপথে পা বাড়ানো সন্তান সুপথে ফেরে কি?
অনেক বাবা মা বলে থাকেন-বিয়ে দিলে সংসার হলে ঠিক হয়ে যাবে। অথচ আয়ত্তের বাইরে চলে যাওয়া নেশাজাত দ্রব্যের প্রতি আকৃষ্ট ছেলেটি পরবর্তী সাংসারিক জীবনে অর্থের জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন করে। আমাদের সমাজে অহরহ ঘটছে এমন ঘটনা। যা সমাজকে কলুষিত করছে সস্নো পয়জনের মতো। এই নিশ্চিত অধপতন ঠেকাতে শিক্ষাজীবনেই শিক্ষার্থীদের মাঝে পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব সমানভাবে দেয়া প্রয়োজন। তা হতে হবে ব্যবহারিক কাজের মধ্যে, তাদের বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে অন্তর্ভুক্ত করে নষ্ট চিন্তা থেকে দূরে রাখতে হবে। তাছাড়া পাঠ্য বইয়ের বাইরেও শিক্ষামূলক গল্প কাহিনী পড়ায় আগ্রহী করে তোলা অনেক ক্ষেত্রেই মূল্যবোধ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।
হাতে গোনা কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রী তাদের ওপর ছুড়ে দেওয়া ক্যারিয়ারের লক্ষ্যে অবিরাম পাঠ্যপুস্তকে নিমগ্ন থাকে। অধিকাংশই শ্রেণি-পাঠের পড়াশোনার বাইরে বেশিরভাগ সময়েই আড্ডা, এখানে ওখানে জোট বেঁধে হাসি তামাসা, বিদেশি চ্যানেলের অপসংস্কৃতি অনুসরণ ইত্যাদিতে সময় অপচয় করে। কিংবা পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য বই পড়া যে দু’চারজন আছে তাদেরও অধিকাংশই শুধুমাত্র নিম্নশ্রেণির উপন্যাসের পাঠক। আমার দেখা অনেকের পাঠ কক্ষের টেবিলে বিনোদন সর্বস্ব নোংরা পত্রপত্রিকার সমাবেশ তার উদাহারণ। আজকাল অশ্লীল ছবি সংবলিত পত্রিকা সংগ্রহ করাও খুব সহজসাধ্য ব্যাপার।
অনেকদিন আগে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রবিষয়ক একটা জর্নাল পড়েছিলাম। বেশ মনে আছে তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন- ইংরেজ বেনিয়ারা একদিন যেভাবে এদেশের মানুষকে ‘চা’ ধরিয়েছিল ঠিক সেভাবেই দেশের লক্ষ্য লক্ষ্য ছেলেমেয়েকে আজ বই ধরাতে হবে আমাদের। মূল্যবোধ প্রসঙ্গ থেকে দেখছি এখন বই প্রসঙ্গে চলে এসেছি; অবশ্য, তা অস্বাভাবিক মনে করছি না। সত্যি বলতে-সন্তানকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে পরিবার, সমাজ, বা রাষ্ট্রে উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজন তার নৈতিক ও মানসিক সমৃদ্ধি। প্রয়োজন মূল্যবোধ ও সামাজিক সচেতনতা। আমি ভালোবাসি আমার দেশকে, আমি প্রত্যেকদিন দেখতে চাই সুন্দর বাংলাদেশকে, আর এ জন্য শিশু থেকেই তাকে স্থিরতা ও অধ্যাবসায় এর মধ্যে অভ্যস্ত করে তোলা জরুরি।
মূল্যবোধ ব্যক্তি জীবনের আচরণগত বৈপরীত্য দূর করতে সক্ষম। সমাজে যে সব সংঘাত ঘটছে একমাত্র মূল্যবোধ অবক্ষয়ের কারণে, নৈতিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ করে এসব সংঘাত এড়ানো সম্ভব। তবে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সহজ ; সমাজ রাষ্ট্রের নিশ্চিত অধঃপতন ঠেকাতে তাই- নৈতিক মূল্যবোধ এর অবক্ষয় রোধ করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, মূল্যবোধকে আইনের ভিত্তি বলা হলেও দুঃখের বিষয় আজকাল আইন রক্ষাকারী বিভাগে দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের অনৈতিকতার কালো ছায়া মূল্যবোধকে নিশ্চিহ্ন করে তুলেছে। এটা তারা ভুলতে বসেছে যে- মূল্যবোধ শিক্ষা- সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সুশাসন নিশ্চিত করে। অপরাধ করার পর বিচার না হলে অপরাধীর উৎসাহ বাড়ে, অপরাধও বাড়ে। তা থামাতে সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
সমাজে বা ব্যক্তি জীবনে মূল্যবোধের সর্বগ্রাসী অবক্ষয় থামাতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই। পাশাপাশি সরকারকে বিদ্যমান আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক পরিচিতিঃ

কবি,লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক

কেন্দ্রীয় সহ-সাধারন সম্পাদকঃ বাংলাদেশ তৃণমূল সাংবাদিক কল্যাণ সোসাইটি।

সাধারন সম্পাদকঃ মানবতার ডাক সামাজিক সংগঠন।

নির্বাহী পরিচালকঃ পথের শিশুর পাঠশালা।

সাধারন সম্পাদকঃ স্বপ্নীলকন্ঠ সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদ,কচুয়া শাখা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here